Tuesday, June 6, 2017

হাসপাতাল ও থানার মাঝে


 মতিউর এক্কেবারে থম মেরে গেছে। ৩৯ ডিগ্রির দুপুরটা মাঝে মাঝে লজ্জা পাচ্ছে ওকে দেখে। অনেক চেষ্টা করে এই ভর দুপুরে খানিক গুমোট মেঘ জড়ো করেছে, গাছ পালা গুলোকেও মোটামুটি ম্যানেজ করে নিয়েছে। সব্বাই মিলে বেশ চুপচাপ একটা লাশ গুম করা পরিবেশ তৈরি করেছে। কিন্তু সব বৃথা। সব। মতিউর একাই পুরো ফুটেজ খেয়ে নিয়েছে, থম মেরে গেছে।
ওর চান ঘেমো সুপারম্যান গেঞ্জি, সাদা নোনা ছাপ বসা কালো টেরিকটের প্যান্ট, ঘাম ঘামাচির সহাবস্থানে হেজে যাওয়া কপাল, সবকিছু কিরম নেতিয়ে পড়ছে ওর ওই থম মারা মুখ দেখে।নাকি আসলে ৩৯ ডিগ্রি বলেই থম থমে ভাবটা বেশি সেটা এখনও অব্দি ঠাওর করা যাচ্ছেনা।
আসলে মতিউর বোঝা আর না বোঝার ঠিক মাঝের কার্নিশটায় ঝুলছে।এমনিতে সে খুব সেয়ানা ছেলে। লোকে তাকে চেনে, তার টেলারিং এর দোকান- শাহেনশাহ কে চেনে, আর চেনে তার ধর্মকে। হাসপাতাল আর থানার মাঝে ৫০০ মিটারের ফিতে মাপা পথ। মাঝে দুটোই মাত্র দ্রষ্টব্যঃ। মতিউরের দোকান আর তার ১৩ ফুট দূরে (যেহেতু পাঁচিল থেকে সাড়ে ছয় ফুট ছাড় রাখাটা নিয়ম) কোমায় চলে যাওয়া মার্কেটটা। ল্যাংটো পিলার গুলো গুটি কয়েক শ্যাওলা বাসী দেওয়াল আর ছাদ নিয়ে খাড়া আছে।এ মার্কেটের কাজ শুরু হয় 'কমলে'ড সজল দাসের আমলে। উনি তখন এলাকার কাউন্সিলর সাথে সাথে পৌরপ্রধান(উ পঃ)। কিন্তু পরবর্তী কালে (যখন লাল আস্তে আস্তে মাঠে ঘাটে, ঘাসে ফুলে মিশে যাচ্ছে) পুরসভার ইঞ্জিনিয়ার আরো কর্মদক্ষ হয়ে ওঠায় মার্কেটের প্ল্যানে অনেক ভুল ত্রুটি ধরা পরল, এবং এলাকাবাসীর সাধের মার্কেট অচিরেই ছাগল, গরু ইত্যাদি গবাদি পশুর প্রাত এবং বৈকালিক ভ্রমনের মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠল।
এই মার্কেট হবার আশাতেই মতিউর স্বপন বুড়োর আধা জ্যান্ত চায়ের দোকানটা কিনে নিয়ে টেলারিং খুলে বসল। তা মার্কেটের গঙ্গা প্রাপ্তি ঘটলেও, মতিউর কিন্তু দিব্ব ব্যবসা জমিয়ে নিয়েছিল, সেয়ানা মানুষ সে।
তো এহেন মতিউর আজ চুপ মেরে গেছে। হাসপাতালের সেজ ডাক্তার আর থানার মেজ বাবুর ট্যারা ব্যাকা চাউনি এবং প্রসঙ্গে।

"আচ্ছা ওই ঘটনার জায়গা থেকে হাসপাতাল কতদূর ছিল?তোর কি মনে হয়?"
মতিউর বুঝতে পারেনা কি উত্তর দেবে মেজবাবু কে;কারণ প্রশ্নখানা মেজবাবুর পাকানো গোঁফের মাখানো হাসির ভাজেই ওকে বুঝিয়ে দিচ্ছে উত্তরটা ভুল হবে।
অতএব ডেলা ডেলা চোখে ৪৯ এর নামতা বলার মতোই বিড়বিড় করতে থাকল মতিউর।

"না আপনি একদম ঠিক বলেছেন।কতোই বা দূর ছিল থানা!!ওর আগে আপনাকে খবর দেওয়া উচিত ছিল।আমি তো ভাবছি অন্য কথা। এ বেটা নিজেই..." ডাক্তারের ইঙ্গিতে মতিউরের বুকের পাঁজর গুলো আর স্থির থাকতে পারলনা, দাপাদাপি শুরু করে দিল।

"আমি তো অতো কিচু ভাবিনি সার। তকন দেকলুম ..."

"কি দেখলি রে পাগলাচোদা ??তুই সব দেখে শুনেও কিছু করলিনা!!নাকি সব ভালভাবে মিটে যাবার পরে হাসপাতালে এলি?? ডাক্তার মিথ্যে বলেনি বলেই তো মনে হচ্ছে এখন!!"

মতিউরের বুকের পাঁজরে ভূমিকম্পের দ্বিতীয় আফটার শক, এবং ডাক্তারের সৌজন্যে অনতিবিলম্বে তৃতীয় শক, " শালা এদের জন্যে পুরো দেশটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বানচোত গুলো যার খায় তারই গাঁড় মারে। এক গুজরাটে শিক্ষা হয়নি এদের।"

"তুই থানায় আগে গেলি না ক্যানো? ভয়ে? নাকি হাসপাতালে ফেলে দিয়ে ভাগবি মনে করেছিলি?"

"না মেজ বাবু। আমি ভাবলুম আগে তো টিরিটমেন লাগবে। তাই হোসপিটাল চইলে এলুম। বড় পীরের দিব্বি দে বলচি।"

"তুমি আমায় পট্টি পড়াচ্চ হারামজাদা??এরম কেস অনেক দেখেছি বুঝলি। শালা উজবুক পেয়েছ আমায়। সত্যি করে বলতো কে কে ছিল??"

"শোন মতি, আমরা ডাক্তাররাই বলি রোগীকে আগে চিকিৎসা তারপরে অন্য নিয়ম কানুন। কিন্তু এ যা কেস এতে তো আগে পুলিশে খবর দেওয়া দরকার ছিল। ওরা এসে জায়গাটা ভালো করে সার্চ করে দেখত। তুই কি কি যে এভিডেন্স ঘেঁটে দিয়েছিস!!"

"বিশ্বাস করুন ডাগতার বাবু, আমি শুধু তুলে নে এখানে এনে রেকেচি। আর কিচ্ছুটি ধরিনিকো।"

"তুমি আক্কেবারে চন্দন ধোয়া তুলসী পাতা আমার! কে কে ছিল বল।" মতিউরের এবার বেশ ভালো বুদবুদ গোছের লাগল মনের মধ্যে, চিরকাল সে জেনে এসেছে তুলসী হল কবরেজদের ইস্কাবনের বিবি। তা থানার মেজবাবু তাকে তুলসী বলেছেন, সাথে চন্দনের সেন্ট!! সেই সেই দিলীপ কুমার ফিলিং এসে জুড়ল সাথে।

না, আমাদের মতিউর বরাবর হিন্দি 'বইয়ের' পোকা। যখন মতিউর সিনেমা দেখতে শেখে তখন মাধুরী 'ইক দো তিন' গুণতে গুণতে 'সাজনের' বুকে কাব্যির আগুন বুনে দিচ্ছে।লোকজন আবেগ মেখে নিজের বউকে ডায়লগ শোনাচ্ছে, " রিস্তে মে তো হাম তুমহারে বাপ লাগতে হ্যায়.."অতএব মতিউর ও মাদ্রাসার বৃত্তিমুলক শিক্ষা ছেড়ে, মহান ভারতীয় সিনেমার সমাজসেবা মূলক শিক্ষা বেছে নিল। যেমন হাতি মেরা সাথী দেখে ও পায়রা পুষতে শুরু করল।সামান্য কাজীর ছেলের কাছে হাতি মানেই ঐরাবত, কিন্তু পায়রা মানেই পায়রাবাজি, পয়সা, বামুনচকের বড় মুখুজ্জের মেয়ে সন্ধ্যার গোল গোল ভীতু চোখের অবাক আকাশ চাউনি। হুঁ হুঁ মতিউর সেয়ানা ছেলে, বরাবর।
কিন্তু এহেন মতিউর ফেঁসে গেছে হাসপাতাল আর থানার মাঝে।মতি মিঞা বুঝতে পারছেনা কতটা বেফাঁস বললে ওর লোম,ঘাম, লালা, বীর্য সব কিছু আতস কাঁচ আতস কাঁচ খেলা শুরু করবে!এই যেমন মেজবাবুর পরের প্রশ্ন,

" অত ভোর বেলা তুই কি করছিলি ওখানে?"

"রমজান মাস পরেছে সার, ঢের রাত্তির অব্দি কাজ  রাত্তিরে তাই দোকানডা তেই ঘুম দি।আজ ভোর রাত্তিরে পেচ্ছাপ পেলি জোর। "

"ও পেচ্ছাপ পেল, আর উনি বস্তু নাচিয়ে বেরিয়ে পরল। পেচ্ছাপ না বাই শালা??"

এবার মতিউরের রাগ এসে গেল। পেচ্ছাপ, মানুষের সব থেকে স্বাভাবিক জৈবিক ক্রিয়া, সেটারও নাকি জবাবদিহি দিতে হবে! এবার হয়ত প্রশ্ন করবে এত জায়গা থাকতে হাসপাতালের দিকে কেন পেচ্ছাপ করতে এল, থানার দিকটা কি দোষ করেছিল!!অথবা ক ফোঁটা পেচ্ছাপ করার পরে ও খেয়াল করল!হয়ত ওকে পেচ্ছাপ করে দেখাতেও হবে এখন, এমনকি চোখ নাক কান মুখ সব অবিকল করে!ওরা বোঝার চেষ্টা করবে কি করে ওর মাথায় থানার বদলে হাসপাতালে যাবার কথা এল! ওতো ছিল হাসপাতাল আর থানার মাঝে।

"সার আমি তো রেতে বিরেতে পেচ্ছাপ চাপলে ওই মার্কেটের ঝোপটার পেচনেই করি! রাস্তা থেকি দেকা যায়না।"

"হ্যাঁ, কিছুই তো দেখা যায়না।তা কদ্দিন ধরে চলছে এসব বানচোদ? আজ কি টান বেশি উঠেছিল?"

মতিউর থান ইটটা খুঁজছিল, লালচে কালচে রক্ত লেপ্টে যেটা ওই ঝোপের পিছনে পরে ছিল। খাপ খোলা দাঁতের কামড়ে ডিজাইন করা মাই, অহংকারী পুরুষাঙ্গের (বা পুরুষাঙ্গদের)দাপটে ক্লান্ত যোনি সহ হাসপাতাল আর থানার মাঝে ৫০০ মিটার রিলে রেসে হেরো সন্ধ্যা মুখুজ্জের খোসা ছাড়ানো শরীরটার পাশেই পরে ছিল ইটটা।



Monday, April 10, 2017

আবীর খেলা

সকাল থেকে আজ আগডুম, বাগডুমের দৌড় ঝাঁপ চলছে।আজ ওদের কমিটির মিটিং আছে। আর তিন দিন পরেই দোল। কিছুই পরিকল্পনা হয়নি এখনো। সেই জন্যে এই জরুরি অবস্থায় মিটিং। মোটামুটি সবাই আসবে। ভুতো, ভোলু, লালু, পঞ্চু, মোতি। রকি, ডন, কুট্টুস, বেবি ওরাও আসার চেষ্টা করবে বলেছে। আর আছে ওদের বড় দাদা ঘোড়াডুম। সেই আজকের সভাপতি। তা এত বড়সড় মিটিং, তাই খাবার দাবারও চাই জমিয়ে। লালি, মিসকা আর পরী খাবার জোগাড়ের দায়িত্বে। পাড়ার তিনটে খাবারের ঠেক থেকে মোটামুটি জোগাড় করে ফেলেছে ওরা। বাকিটা জোগাড় হবে ওই মিত্তিরদের বাড়ী থেকে। কাল ওদের ছোট ছেলে রিন্টুর জন্মদিন ছিল। রিন্টু ভীষন ভালো। এমনি দিনেই বেঁচে যাওয়া খাবার ওদের দিয়ে দেয়। আর কালতো ওর জন্মদিন ছিল। খাবার বাঁধা ওই বাড়ী থেকে।
তা আজ আগডুমদের ওই গ্যারেজ এর পিছনেই আজ মিটিং হবে। আগডুম বাগডুম বেশ ভালই সাজিয়েছে। সবাই এসে গেছে। চুপচাপ বসে বসে কেউ চেটে চেটে হাত পা পরিষ্কার করছে, কেউ আবার অন্য জনের কান সাফ করে দিচ্ছে। আর দু তিন জন তো দিব্বি গোল পাকিয়ে ঘুম দিচ্ছে। কারন ঘোড়াডুম এখনো আসেনি।
বাগডুম সবে ভাবছে যাবে কিনা ডাকতে ঘোড়াডুমকে অমনি দেখতে পেল আসছে ঘোড়াডুম, সাথে রিনটি কে নিয়ে।
অতঃপর সভা শুরু হল।
"ভৌ ভৌ ভৌ ভৌ ঘৌ ঘৌ ঘৌ ঘৌ ...." শুরু হলো সমবেত প্রার্থনা সঙ্গীত। এবার ঘোড়াডুম শুরু করবে।
"বন্ধুগণ আজ আমাদের এই মিটিং ডাকার একমাত্র কারণ হল দোল। আমরা জানি বিগত কয়েক বছর ধরেই দোলের দিন আমাদের চূড়ান্ত ভোগান্তি গেছে। পাড়ার বিচ্ছুরা যে ভাবে গায়ে রং ঢেলে দিচ্ছে তাতে আমাদের ভীষন ক্ষতি হচ্ছে। ওই বিষাক্ত রং গুলো চেটে, চেটে তোলা অসম্ভব হয়ে যায়। আমাদের চামড়ায় ঘা হয়ে যায়, পোকা ধরে যায়! রং গুলো পেটে গিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়।" একদমে এত গুলো কথা বলে থামল একটু ঘোড়াডুম। তাকাল ভুতোর দিকে। ওর শাগরেদ। ভুতো বুঝলো ওকে বলতে হবে এবার। ঘোড়াডুম এর বয়স হচ্ছে। হাঁপিয়ে যায়।
"তা মাননীয় সভাপতি যা বলছিলেন বন্ধুগণ। দোল মানুষদের খুব আনন্দের এক উৎসব। রং বসন্ত।" - মোটামুটি স্বভাব কবি ভুতো বলতে লাগল।
"আমরাও এই দোল উৎসব দেখতে বেশ পছন্দ করি। কচি কাঁচা গুলো কিরম লাল,হলুদ,বেগুনি,সবুজ,গোলাপি রঙে ফুলের মত ফুটে ওঠে। চারিদিকে বেশ আবীর আবীর গন্ধ। "
"তবে সব থেকে ভাল হলো, ওদিন প্রায় সব্বার বাড়িতে মাংসের হাড্ডি গুলো পাওয়া যায়।খাসি , মুরগি এলাহি কান্ড।" ভোলু বেশ জিভ চেটে বলল।
"আহ আসল কথাটা হোক" ঘোড়াডুম খেই ধরল আবার।
"আমাদের উদ্দেশ্য হল যে ভাবেই হোক এই বছর ওই রং আমাদের গায়ে দিতে দেওয়া যাবেনা। তোমরা রং খেল না বাপু। তোমাদের তো সাবান শ্যাম্পু আছে। আমাদের কি হবে!! তাই বন্ধুগণ আজ এই সভাতেই ঠিক করতে হবে কিভাবে ওই রঙের হাত থেকে বাঁচা যায়। নাও এক এক করে বুদ্ধি দেওয়া শুরু কর।"

-" আজ্ঞে আমরা যদি ওদের দিকে তেড়ে যাই যখন ওরা রং দিতে আসবে??একসাথে দল বেঁধে তেড়ে যাবো।" লালুই প্রথম মুখ খুললো।

-"তোর মাথায় কি একটুও বুদ্ধি নেই?বোঝাই যায় মাছের কাঁটা বেশি চিবুসনে তুই!!ওরা পিচকারী দিয়ে দূর থেকে রং দেবে। বালতি করে ছুঁড়ে মারবে। তুই কি করবি??" আগডুম এতক্ষন পরে কথা বলল।

-"তা যা বলেছিস। ওই ঘোষাল বাড়ির বড় ছেলেটা তো খুব বদমাশ। আগের বার এমন রং দিলো ছোটুটার গায়ে, ছোটুর অমন সুন্দর চেহারা কিরম হয়ে গেল ঘা হয়ে।" আগডুম কে  বাগডুম সমর্থন করল।

-"তবে যাই করি আমাদের সেদিন দল বেঁধে থাকতে হবে। একসাথে মিলে মিশে থাকলে আমাদের জোর অনেকটাই বাড়বে।"   বিজ্ঞের মত , কিছুটা ওই ক্রিকেট মাঠের ভাষ্যকারের মত পঞ্চু ফুট কাটল।

-"আচ্ছা সেদিন ওই একটা দিনের জন্যে আমরা কোথাও চলে গেলে হয়না আগডুম দা??সবার থেকে লুকিয়ে।"

-"বাজে বকিসনা মোতি। কোথায় যাবো। সব জায়গায় তো একই অত্যাচার।"

-"অনেক তো ভাবলে তোমরা, আমি এবার বলি?" কুট্টুস এতক্ষন চুপ করে সবার কথা শুনছিল। ও বলতেই সব্বাই চুপ করে গেল। আগের বছর দোলেই গায়ের রং সাফ করার জন্যে তোতোনদের বাড়ির পিছন দিকটার পুরোনো ঘরটায় ঢুকে পড়েছিল। গাদা গুচ্ছের পুরোনো বই স্তুপ হয়েছিল ঘরটায়। তার মধ্যে টেনিদা নামের কোন একটা বইয়ে নাকি ও গা মুছেছিল। শেষে খিদে পেতে কটা পাতা নাকি চিবিয়ে নিয়েছিল!! সেই থেকেই ওর বুদ্ধিটায় বেশ পাক ধরেছে।

-"শোনো আমরা রং দিয়েই রং খেলার এই সমস্যা মেটাবে।"

-"রং দিয়ে রং!!"  ঘোড়াডুম খানিকটা চমকেই উঠলো!

-"হ্যাঁ, রং দিয়ে রং। শোনো, আমাদের আবীর জোগাড় করতে হবে বুঝলে। আবীর অনেক কম ক্ষতিকারক। আর ভালো আবিরের তো কোনো ক্ষতি হয়না।দোলের দিন ভোর বেলা থেকে আমরা নিজেদের মধ্যে সুন্দর ভাবে রং খেলতে খেলতে মিছিল করে পাড়া দিয়ে গান গাইতে গাইতে যাব। মানুষ গুলো সেই দেখে যদি একটু লজ্জা পেয়ে শুধরায়!!"

-"ভৌ ঘৌ, ঘৌ ভৌ, ভৌ ভৌ, ঘেউ ঘেউ.."যে যার মত করে সমর্থন জানাল এই প্রস্তাব কে। একদল বেরিয়ে গেল রংটা জোগাড় করতে পরিকল্পনা মত। আর বাকিরা গানের রিহার্সাল দিতে লেগে গেল।

দোলের দিন সক্কাল থেকেই গোটা পাড়ার ঘুম মাথায় উঠল। তারস্বরে সব কটা কুকুর একসাথে চিৎকার করছে। তবে বেশ তাল মিলিয়ে!! লোকজন তো ধরেই নিয়েছে পাড়ায় ভোর বেলা ডাকাত পড়েছে। সব পড়ি কি মরি করে ছুটে বাইরে এল। এসে সব্বার চোখ ছানাবড়া!!! গোটা দশেক কুকুর লাইন দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। এই ভোর বেলাতেই কারা যেন পুরো রং ভূত করে দিয়েছে আবীর মাখিয়ে!!
দাশ বাবুর নাতনী হাততালি দিয়ে উঠল, "ও বাপ্পি , ডাদ্দা সবুজ কুকুল, লাল কুকুল, কি মজা।"

ওদিকে তখন রিন্টুদের বাড়িতে হুলুস্থুল কান্ড।কারা যেন রিন্টুর জ্যাঠার গ্যারেজে ঢুকে চুরি করেছে। আজ রং খেলবেন বলে ভদ্রলোক ফুলের পাপড়ির আবীর এনেছিলেন শান্তিনিকেতন থেকে!!

Wednesday, March 15, 2017

মেঘবসন্ত

মেঘবসন্ত ,চলো আবির খেলি
ভোরের আঁচে যখন উনুনের ঘুম ভাঙে
কিংবা শেষ রাতে; যখন মনসুর মিঞা নদীতে জাল গুটিয়ে আনে, রুপোলি জলে চোখ ধুয়ে!
বা সকালটাও মন্দ নয়; ওই যখন মার আদর শাসন হয়ে পড়তে বসে যায়,
আর উঠোন জুড়ে রাজা রানী খেলা।
তুমি তো আবার সন্ধে ভালোবাসো,বসন্তের;
ঈশান কোণের বিষণ্ন বৃষ্টি ধরে যে মেঘেরা আসে,
ওরাই তো খেলবে তোমার সাথে,
বিকালের ফেলে যাওয়া রোদ্দুর গুঁড়ো দিয়ে!
কিংবা এই রাতের বসন্তবৃষ্টির আবীর আলোর ঝিকিমিকি দিয়ে!!

Wednesday, March 8, 2017

সাদা মানুষ



বেনীআসহকলা। সাতরঙা রামধনুর ডাক নাম। বেগুনি, নীল, আকাশী, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল। এখন ভাবার বিষয় রঙ গুলো কে নিয়ে। যেমন, বেগুনী রঙের নাম বেগুনী কেন? বাঙালীর ঘরে ঘরে অপরিহার্য ( অ্যালার্জির মানুষেরা সাবধান!!) বেগুন নামক সবজিটির নাম থেকেই কি এর উৎপত্তি? মানে বেগুনের গায়ের রঙটাই তো  সেরম ইঙ্গিত দেয় খানিকটা!! বা ধরা যাক নীল আর আকাশী কে। আকাশের গায়ের রঙটা কি? বোকা চোখে দেখে মনে হয় এটা আকাশী ছাড়া অন্য কিচ্ছুটি হতে পারেই না। অথচ কবির চোখে আকাশ কখনও নীল কখনও আকাশী। এবার লেখকের দৃষ্টি নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা ধৃষ্টতা। অতএব “আকাশের অনেক রঙ”। এই একই প্রশ্নে বিজ্ঞান কিন্তু লেখকের যুক্তি নস্যাৎ করে দিয়েছে!! বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায়, আকাশের আদতে কোন রঙই নেই। বিবর্ণ। ওই নীল বা আকাশী যাই দেখা যাক না কেন, সেটা আসলে আলোক তরঙ্গের কারসাজি!! তবে সব থেকে আরামদায়ক রঙ বোধহয় সবুজ। সময়ের তাল জ্ঞান হারিয়ে ফেলে, চোখের সাথে সবুজের কাটাকুটি খেলায় দিব্বি মাতা যায়। সেই প্রস্তর যুগ থেকেই অথবা তার থেকেও নিরীহ যুগ যখন ছিল, তখন থেকেই সবুজ মানে গাছ। সবুজ মানে প্রাণ। অথচ এই পৃথিবীর কোটি কোটি সবুজের উৎপত্তি নাকি এক পুঁচকে কণা, ক্লোরোপ্লাস্ট থেকে!! এহেন সবুজের পাশাপাশি খুব মিষ্টি আর দামি রঙ হল হলুদ। রঙটার সাথে মিষ্টি বিশেষণটা জুড়ে যাবার পিছনে অবশ্যই দায়ী লাল পেড়ে হলদে শাড়ির কন্যে। আর প্রাকৃতিক কারনে কাঁচা সোনার রঙ হলুদ হওয়াতে দামি রঙের তকমাটা হলুদের কাছেই গচ্ছিত!!তবে  মজার রঙ হল কমলা। রঙটাকে একটু হালকা করে ভেবে নিলেই (বা জলে গুলে নিলে) সনাতন ধর্মের এক মহান রঙ এসে হাজির হয়, গেরুয়া! ভারতীয় সভ্যতায় ত্যাগ, শৌর্যের প্রতীক ( বি.দ্র- বর্তমান পরিস্থিতিকে মাথায় রেখে সব রকম ঘটনাবলিকে সন্দেহের তালিকাভুক্ত করা হয়নি)। অবশিষ্ট থেকে যায় বিপ্লবী রঙ, লাল...

-“এই যে চা তো পুরো জল হয়ে গেল। কখন দিয়ে গেছি। জানলার বাইরে হাঁ করে তাকিয়ে কি এতো ভাবছ!!একটু রান্না ঘরে এসে হাতে হাতে কাজটা  এগিয়ে দিলে পারতো!! জানতো আজ মালতী আসবেনা!!”

ব্রতীন খেয়ালই করেনি গীতবিতানের উপর রাখা চশমাটা কখন যেন চায়ের খেয়ালি ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে গেছে। মাধবী না ডাকলে হয়ত ভাবনা চিন্তা গুলো নিয়ে আরও চুলচেরা বিশ্লেষণ জমে উঠত।

প্রসঙ্গত পাঠকের সাথে এইখানে একটু আলাপচারিতার প্রয়োজন আছে। শুরু হয়েছিল রঙের কাটাছেঁড়া দিয়ে, হঠাত করে দুটি মানুষ এর আবির্ভাব কি করে!! কারসাজিটা এইখানেই। ব্রতীন এর চিরকালই রঙের প্রতি দুর্বলতা। এইবার সেই দুর্বলতার আখ্যানে মাধবী কিছুটা গোঁজ প্রার্থী হিসেবেই আসন্ন।

ব্রতীন জানত আজ মালতী আসবে না, রবিবার হওয়া স্বতেও (যেহেতু সপ্তাহের বাকিদিন একটাও কাজ থকেনা ঘরের, রবিবার ছাড়া!!)। আগেভাগেই বলে গেছে। অকাট্য যুক্তি সমেত, “অন্য দিন তো বৌদিদি বুলিকে দেইকবার মত কেউ থাকিনি। রোব্বার তমরা দুজনিই আচ। আমার ছাওয়ালটারে অনেক দিন হল দেকিনি। এ রোব্বার টা ছুটি দেও। বাড়িডা ঘুরে আসি ক্যানে।“মাধবীর আপত্তি টেকেনি। আসলে ব্রতীন বুঝতে চেয়েছিল, রঙের পরিবর্তনটা।
ছেলেবেলায় দেখত, যেটুকু দুধ বাঁটে থাকলে ভোলা কাকার ব্যবসায় কোন ক্ষতি হয়না সেটুকু দুধই খাবার জন্যেই ওদের খয়রী  ঘিয়ে বাছুরটা ছাড়া পেত। তখন ওর মনে হত বাছুরটা এক দলা প্রাণের উচ্ছ্বাস। সবুজ। কিন্ত গাইটাকে দেখে কিছুতেই বুঝতে পারতোনা কোন রঙে মেলাবে ওই ভাবলেশহীন প্রাণীটাকে। সেটা অবশ্য মালতীকে দেখেও বুঝেতে পারেনি ওর বাড়ি যাবার সকালে।

 সবুজ রঙটা ব্রতীন অনেক জায়গাতেই বুঝত পারে। যেমন ওদের মেয়ে বন্যা বা আদরের নামে বুলি। বয়স ৫ বছর ৯ মাস ২৫৪ দিন (হিসেবের কৌতূহল পরে মেটানো হবে অবশ্যই)। বন্যা নামটা সার্থক। বুলি বন্যার জলের মতই বাঁধ ভাঙা। প্রাণে ভরপুর ওটুকু মেয়েটা যতক্ষণ জেগে থাকে নিজের সাথে বাকিদেরও  ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সবুজ। ব্রতীন তো জানে ছেলেবেলা মানেই সবুজ। ওর নিজের ছেলেবেলা তো কেটেছে ধামাইতলায়। ব্যাঙাচি জীবন। খালে বিলে মাঠে ঘাটে। স্কুল থেকে ফিরেই বাস রাস্তার ধারের মাঠে বল নিয়ে লাথালাথি, কোনোদিন ভোলা কাকার পেয়ারা বাগানে দল বেঁধে কবাডি।  মনে আছে বর্ষার প্রথম পানি পরার সাথে সাথেই ওরা ছুটত চুবড়ি নিয়ে, বিলের ধারের চান করা ঘাস গুলো থেকে ব্রতীন সবুজ গন্ধ পেত। মাছের থেকেও ওই গন্ধ ওকে টানত বেশি। ব্রতীন বোঝে ছেলেবেলা মানেই সবুজ।

আধা ঠাণ্ডা (ইতিবাচক ভাবলে অবশ্য আধা গরম!!) চা-টা শেষ করে ব্রতীন উঠে পরল। বাজার যেতে হবে, ফেরার পথে বুলিকে নাচের ক্লাস থেকে নিয়েও আসতে হবে।

-“মাধু, বাজারের ব্যাগটা কোথায়? সবজি কি আনতে হবে বল। এই সপ্তাহে কিন্তু আমার ফিরতে রোজ দেরি হবে। অফিস ফেরত বাজার করতে পারব না!!”

 -“সব কিছুই কি এখন এভাবে বলা যায় নাকি!!ফ্রিজটা খুলে দেখ কি কি আছে। মাঝে লাগলে কিছু আনতে তো হবেই!”

-“কে আনবে শুনি? তুমি  অফিস ফেরত বাজারে ঢুকবে মাধু!! থাক তার চেয়ে আমি নিয়ে আসি আজ যতটা যা পারি।“

 -“হ্যাঁ তোমার তো ধরতে বললে বেঁধে আনার স্বভাব! তারপরে সবজি পচলে বলতেও ছাড়বে না!”

ব্রতীন আর কথা বাড়ায় না। এমনিতেই আর একটু বেশি দেরি হলে বাজারের রঙ গুলো সব হাপিশ হয়ে যাবে। বিশেষ করে রবিবারে। বাজারে যেতে ব্রতীনের বরাবরই বেশ ভাল লাগে। চরিত্রের উথালপাতাল। ধরা যাক মাছ ওয়ালা কে। পারলে হিমঘরের কাতলা মাছটাকেও কয়েক ঘণ্টা আগে জ্যান্ত বানিয়ে দেয়। তার উপরে আছে রকমারি হাঁক। যেমন মতিন মিয়াঁ, মোটামুটি পুকুরের তাজা মাছ আনে লোকটা। বাজরে ঢুকতেই শোনা যায় মতিন হাঁকছে, “খালি পাতলা করে বেগুন বড়ি ঝোল, খালি পাতলা করে”।নতুন নতুন বাজারে বাবুরা একটু চমকে যায় বটে, কিন্তু ব্রতীনের মত বারো মাইস্যারা জানে আজ মতিন নির্ঘাত জ্যান্ত পোনা মাছ এনেছে। সবজি-ওয়ালাদের তো আরও বড়সড় ব্যাপার। এরা তো পাইকারি মার্কেটকেই অস্বীকার করে। সবার দাবি, সব সবজি তাদের নিজের ক্ষেতের মাল। এদের সবথেকে মজার মিল হল, দাম কমাতে বললেই এদের মুখটা ঠিক বাসি বেগুনের মত চুপসে যায়!! এমনিতেই ব্রতীন মনে করে, বাজারের খদ্দের গুলো সব বেগুনী রঙের লোক। গুণী জনে বলে যে, বেগুনী নাকি স্বপ্নের রঙ, কল্পনার রঙ। তা বাজারের খদ্দেরের থেকে বেশি কল্প বিলাসী তো কেউ হয়না!! ইলিশ কেনার আগে দুবার চোখ বুজে ভেবে নেয় ভাপা না শর্ষে!! চিংড়ির সাথে কচু না এঁচোড় ভাবতে ভাবতে বিকালের চায়ের সাথে চিংড়ীর চপের জোগানও হয়ে যায়!! ব্রতীন নিজে অবশ্য চিংড়িতেই বেশি ঝোঁকে।  আজও তালে ছিল গলদা হাতাবার, জুতসই পেলনা। অগত্যা পারশে আর ভোলা তুলেই ছুটল সবজির দিকে। বুলির নাচের স্কুল ছুটির সময় হয়ে এসেছে। মেয়েটা একা দাড়িয়ে থাকবে ওর দেরি হলে।

নাচের স্কুল থেকে ফেরার সময়টুকু বাপ বেটির একান্ত আপন। আগডুম বাগডুম কথা।অন্তহীন জিজ্ঞাসা। ব্রতীন তখন বিক্রমাদিত্য, বুলি বেতাল!! আসলে বুলি হল ব্রতীনের মিঠে পাকের রোদ্দুর বা বলা ভাল সোনার জিয়ন কাঠি। হলুদ আবির। বুলির প্রতিটা দিনকে ব্রতীন ধরে রাখতে চায়। আজব খেয়াল ওর, বুলির জন্মের দিন থেকেই বুলিকে নিয়ে ডায়রি লেখা শুরু। দিন ধরে ধরে রোজনামচা (পাঠক এবার হিসেব পেয়ে গেলেন??)! মাধবী বলে আদিখ্যেতা!! কিন্তু ব্রতীন জানে বুলি ছাড়া ওর হলদে গোলাপটা ফ্যাকাসে হয়ে যাবে, ভেজা বালির  মত। তখন ডায়রির পাতা গুলোই বুলি হয়ে আদর খাবে।

-“তুমি আজও আইসক্রিম কিনে দিয়েছ বুলি কে!! এরপরে ঠাণ্ডা লাগলে কি তুমি সামলাবে শুনি??”

-“ আরে সপ্তাহে একটা আইসক্রিম খেলে কিচ্ছু হয়না মাধু।“

-“না কিচ্ছু হয়না!! উনি এলেন আমার বিলেত ফেরত ডাক্তার!! কদিন আগেই তো ভুগল মেয়েটা। নিজে তো দিব্বি অফিস এর কাজে পুনে চলে গেলে। যত ঝঞ্ঝাট তো আমাকেই পোহাতে হল।“

-“দেখ মাধু বাড়ি থাকলে আমিও রাত রাত জেগে বুলির মাথায় জলপট্টি দিই জ্বর হলে। আমি ওর বাবা। আমি কখনই ওর খারাপ চাইব না। ওটুকু মেয়ের আর তো কোন সাধ আহাল্লাদ নেই, না খেলনা চায় না অন্য কিছু। শুধু তো আইসক্রিম দেখলেই ওর একটু…”

-“ দেখ ব্রতীন তর্ক করতে ভাল লাগছে না আমার। বাড়িতে থাক কতক্ষণ তুমি?? মেয়ের ভাল মন্দ নিয়ে আমায় বোঝাতে এলেন উনি!!”   ব্রতীন চুপ করে যায়। একথার কোন উত্তর নেই ওর কাছে। ওর মা কেও দেখত বাবার সাথে এভাবে ওকে নিয়ে ঝগড়া করতে। বাবা বলতেন, “শাসনের শিকল পায়ে বেঁধে মানুষ করা যায়না। ” আর মার এতেই আপত্তি। অনুশাসনের লক্ষণ গণ্ডি । মাঝে মাঝে তো মাকে রামায়ণের রাক্ষুসীও ভেবে বসত!! কিন্তু মা যে আজকাল স্বপ্নে অন্য রকম ভাবে আসে ব্রতীনের। গেরুয়া তে। ঠিক যেন সাধিকা। সংসারের জোয়াল ঠেলতে নিজের সব কিছু ত্যাগ করেছে। সকালে উঠে হেঁশেলে ঢুকে পরা, বাবা বেরোবে তার জলখাবার, ব্রতীন স্কুল যাবে, তাকে খাবার দেওয়া। তার নিজেরও যে খিদে বলে কোন অনুভূতি আছে, সেকথা তাকে মনে করাবার কেউ ছিলনা!! সমুদ্র মন্থনে সবাই অমৃত নিয়ে লিখল, হলাহল নিয়ে বললে, কূর্ম, মোহিনী, বাসুকি, ঐরাবত সব্বাই এলে, কিন্তু কেউ মন্দার পর্বত কে নিয়ে বললে না। নিজের ক্ষয় সয়েও মন্দার মন্থন থামতে দেয়নি। মা বুঝি ওই মন্দার এর  ব্রতীনের মাথায় হাওয়া করা থামায়নি, ছেলে যে কাল সকালে উঠে যে পড়তে যাবে। এখন যেমন মাধু করে।

মাধবীর সাথে ব্রতীনের পরিচয় পর্বটা বেশ গোলমেলে। বলা ভাল গোলমালের মধ্যে। মাধবী গেছিল ইউনিভার্সিটির ফর্ম তুলতে। ব্রতীন তখন ছাত্র ইউনিয়নের উঠতি মুখ। প্রাগৈতিহাসিক সমাজ ব্যবস্থাকে যেকোনো মুহূর্তে বিপ্লবের ধারে ভেঙে ফেলবে। লাল রঙের মতই চড়া টগবগে ভাষণ। শ্রেণী বিদ্বেষ, দিশাহিন উদার অর্থনীতি, রাষ্ট্র যন্ত্রের শোষণের বিরুদ্ধে তখন ব্রতীনের ভাষণ তখন বিপ্লবের লাল রঙের মতই ধারাল। ইউনিভার্সিটিতে তখন ছাত্র ভোট আসন্ন। এহেন অবস্থায় যেদিন মাধবী ওর বান্ধবীদের সাথে ফর্ম তুলেতে এলো, মদন দেবের (পাঠকের ভ্রম দূর করতে বলে রাখা ভাল ইনি হলেন হিন্দু পুরাণ মতে মিলনের দেবতা) কারসাজিতে বা কোন পূর্ব নির্ধারিত সমাপতনে ছাত্রদের দু পক্ষের মধ্যে তুমুল গণ্ডগোল শুরু হল। ধাক্কাধাক্কিতে পরে গিয়ে বেশ চোট পেয়েছিল মাধবী। ওর ডোরা কাটা নীলচে শাড়ীটা রক্তে ভিজে কালচে হয়ে গেছিল। তবে ওই সমাপতনের কারনেই বোধহয় এইসবের মধ্যে ব্রতীনের জরিয়ে পরা। মাধবীকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফিরে আসার সময় ব্রতীন বুঝল ওর আশপাশটা আর লালচে নেই। বসন্তের নীল রঙের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। অ্যাক্সিডেন্টে বাবা মা মারা যাবার পরে কলেজ, পার্টি আর বইয়ের মধ্যেই নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছিল ব্রতীন। থেঁতলে যাওয়া লাল কালচে মুখ দুটো বিড়ালের চোখের মত রাতের অন্ধকারে জ্বলজ্বল করত ওর সামনে। লাল রঙটা যেন সবসময় ওকে তাড়া করে বেড়াত। এই সময় মাধু এলো। আকাশের মত নীল দুটি চোখ, কি গভীর অথচ শান্ত। ব্রতীনের মনে হল ও ‘অমলকান্তি ‘ হয়ে যায় বা এক পশলা মেঘ। আকাশী হয়ে মেখে থাকে নীলচে মাধবীলতার গায়ে পায়ে। মাধবী ও বুঝেছিল আকাশী আর নীলকে একসাথেই থাকতে হয়, মেঘ হয়ে।

-“কিগো কোন জামাটা বের করবো তোমার জন্যে?”

-“জামা??”

 -“কি হয়েছে কি তোমার আজকাল বলত? কিছুই কি মনে থাকেনা!!”

 -“না মানে... আমি আসলে ...”

-“বুলির ডায়রি লিখছিলে তো? সারাদিন কি এই করলে চলে ব্রতীন? তুমি ভুলে গেলে আজ সুনন্দর জন্মদিন। সেদিন এতো করে বলে গেল যেতে।“

-“ও হ্যাঁ...তুমি বরং ওই সাদা রঙের জামাটা বের কর,যেটা তুমি পুজোয় দিলে।“

-“আমি আর দিলাম কই। নিজেই তো বেছে নিলে। কি যে সাদায় পেয়েছে তোমায়!!”

সাদার প্রতি মাধুর বিরক্তির কারন আছে অনেক। একে তো রঙটাকে কিরম ফ্যাকাসে লাগে ওর। যবে থেকে ভাল করে রঙ চিনতে শিখেছে, তবে থেকেই দেখছে মা, ঠাকুমা সাদা পরে। তবে ব্রতীনের ব্যাপার আলাদা। ও বেশ বুঝতে পারে আগে যে রঙ গুলো ওর চারপাশে গাছ-পাখালি, হরতন-ইস্কাবন হয়ে দাপিয়ে বেরাত, তারা সব চুপচাপ হয়ে আসছে। স্বপ্নের অজুহাতে ওর অনুভুতির চৌকাঠটা ফ্যাকাসে করে দিচ্ছে, মালতীর মত। বিছানা, বালিশ, আদর, রাস্তা, ছাদ, সূর্য সব কিছু থেকে ওরা সরে যাচ্ছে, ওরা একসাথে। ব্রতীন জানে, ওরা ব্রতীনের কাছেই আসছে। গাণিতিক অনুপাতের সমান হারে একসাথে মিশে যাচ্ছে ব্রতীনের জন্যে। সাদা মানুষ হয়ে!!     -----------০------------




উদযাপন


৩১শে ডিসেম্বর, ২০১৬। এই বছরটাও শেষ হয়ে এলো। চারিদিকে উৎসবের গন্ধ। বড়দিনের ফ্লুরিস এর কেকের গন্ধের মতোই মাখোমাখো। বাইপাস এর ধারে এক বন্ধুর ফ্ল্যাটে জমা হয়েছে রৌনাকরা। রৌনাক, অভি, কৃষ, দীপ আর ওদের বান্ধবীরা। উদযাপন করতে, বর্ষবরণ করতে। প্রতিবছরই শেষ দিনটা ওরা এরম জড়ো হয়।
ম্যারিনেট করা মাংসটা অপেক্ষায় আছে কখন কড়াইয়ের ফুটন্ত তেলটায় শরীরটা ছেড়ে দেবে।
"রেড লেবেল এর বোতলটা খুলি? ২ লিটার শেষ করতে হবে তো। শুরু হোক।" কৃষ বললো।
"দাঁড়া আগে পাকোড়া টা করি। অত তাড়া কিসের তোদের!!" , আদ্রিতা, কৃষের বান্ধবী বললো।
"উম্ মটন এর গন্ধটা তো খাসা হচ্ছে গুরু। নাহ আমাদের অভি কিন্তু বেড়ে রাঁধুনি। মানতেই হবে।"
"শুধু রাঁধুনীর গুণ দেখলে হবে রৌনাক, দ্যাখ মটনটা কোথাকার। হরিনঘাটার খাসি এটা।হু হু বুঝতে হবে ব্যাপারটা।" দীপ উত্তর দিল।
রাত ১১টা বাজে। দু লিটার রেড লেবেল নিঃশেষ। তবু নেশা ঠিক জমেনি। অগত্যা ব্ল্যাক ডগের আরো এক লিটার। আজ উদযাপন হবে।
৩১শে ডিসেম্বর,২০০৮।রৌনাক অপেক্ষা করছে বাবা কখন আসবে।উচ্চ মাধ্যমিক সামনেই। তবুও আজ ইন্টিগ্রেশন এর কিচ্ছু মাথায় ঢুকছেনা। রাত ৯টা থেকে দুরদর্শনে অনুষ্ঠান শুরু হবে।ওদের সাদা কালো টিভিটার অনেকদিন হলো। মাঝে মাঝেই জবাব দেয়।কিন্তু রৌনাক আজ পিলুদা কে ডেকে টিভিটা দেখিয়ে নিয়েছে। সাবধানের মার নেই।
তবে রৌনাক এর উত্তেজনাটা অন্য জায়গায়।
কাল বাবার জন্মদিন। এই বছর থেকে ও কটা ছাত্র পড়াতে শুরু করেছে। জমাচ্ছে, একটা রঙিন টিভি কিনবে। কেবল লাইন নেবে। তাহলেই আর খেলা দেখতে বারবার মাসির বাড়ি যেতে হবেনা। বিরক্তির চোখ রাঙানিতে আর চোখ নামিয়ে বসে থাকতে হবেনা।
কিন্তু আজ আনন্দ অন্য কারনে। কাল বাবার জন্মদিন। রৌনাক বাবার জন্যে একটা ভালো পেন কিনে এনেছে, পড়ে ফেরার সময়। আর একটা কেক। বাবা ২৫ তারিখ করে আনে। সোনারপুরে স্টেশন এর পাশেই বসে লোকটা। গরম কেকের পোড়া গন্ধটা ভীষণ মন কেমন করে দেয় ওর। ওখান থেকেই এনেছে। জানে বাবা বকা দেবে এসব আজে বাজে খরচের জন্যে। তবুও সে উদযাপন করতে চায়। বাবা বকতে বকতে যে হেসে ফ্যালে, ওই হাসিটুকুর জন্যেই।
রাত ১২টা বাজলো। চারিদিকে তুমুল হই চৈ। নতুন বছরের জন্ম হচ্ছে। বাজি ফাটছে।রৌনাক এর একটু চড়ে গ্যাছে। যতই দামি স্কচ হোক, পাঞ্চ তো হলোই। অভি ডাকলো,"এই রৌনাক , ছাদে চল। ফানুস টা উড়াবো তো।চল চল। শুয়ে পড়ল শালা।ওঠ।"
কাল বাবার জন্মদিন তো। ইস বাবার মানিব্যাগ টা ছিঁড়ে গ্যাছে দেখছিলাম। কাল একটা কিনে নিয়ে গেলে হয়। রৌনাক এর মনে পড়ল। পর পর মনে পড়তে থাকলো। রৌনাক উদযাপন শুরু করলো।।

গন্ধ

একটা অদ্ভুত বিটকেল গন্ধ দুদিন ধরে নাকে সেঁটে বসে আছে। মস্তিষ্কের যে কোষ গুলি ঘ্রাণ অনুভব করে, তাদের ঘুম কেড়ে নেওয়া গন্ধ। অথচ কলকাতা পুলিশের দীর্ঘদিনের পোড় খাওয়া অফিসার দীনেশ দত্ত বহু রকমের গন্ধ চেনেন।
ছেলেবেলায় বাড়ির উঠোনের বকুল ফুল গাছটা তার খুব আপন ছিল। সেই গাছের সাথেই তার ছেলেবেলার গন্ধটা বহুদিন মিশে ছিল।
চাকরি জয়েন করার মাস ছয়েক আগে, এক বৃষ্টির সন্ধ্যায় মা কে যখন চিতায় তোলা হলো, সেই তার প্রথম চামড়া পোড়ার গন্ধ পাওয়া।যদিও সেবার চামড়ার থেকেও মায়ের আদরের গন্ধ বেশি মিশে ছিল।
জীবনের প্রথম অনুভূতিহীন গন্ধটা পেয়েছিল পুলিশ ট্রেনিংয়ে। বারুদের গন্ধ।
কলকাতায় পোস্টিং এর পরে একদিন মন ভালো করা গন্ধ পেল সোনাগাছিতে লক্ষ্মী মাসির ঘরে। পাতানো মেয়ে।সেদিনই প্রথম পিয়ালিকে দেখেছিল। বাংলাদেশের মেঠো রূপে সেই প্রথম কেমন একটা অন্য গন্ধ পেয়েছিল। পদ্মার বান ডেকেছিল বুকের ভিতর।তারপর থেকে প্রতি সপ্তাহে, যতদিন না পিয়ালি হারিয়ে গেল শুধু গন্ধ টুকু রেখে।
তবে এতদিনে সব থেকে ঘনিষ্ঠ হয়ে গ্যাছে মর্গের ওষুধ ভেজা অদ্ভুত গন্ধটা। ওটা এখন নেশার মতই হয়ে গ্যাছে। পচা লাশের গন্ধ আছে বলেই ওদের মতো পুলিশের চাকরি আছে।
 প্রতিবার এনকাউন্টার এর পরেও একটা অদ্ভুত গন্ধ পায় দীনেশ। মাঝে মাঝে মনে হয় পিছন থেকে গুলি করে মারা লোকগুলোর অশরীরী গন্ধ ওটা।
তবে এই গন্ধটা নেওয়া যাচ্ছে না। পরশু থেকে হচ্ছে। ৬টা খুনের আসামী, দাদার আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে বেলগাছিয়া দাপিয়ে বেড়ানো দিলীপ।কদিন ধরেই ওপর থেকে চাপ আসছিল দিলীপ কে ঠুকে দাও। নয়তো একটা যুৎসই কাজের মতো কাজ ভোটের আগে দেখানো যাচ্ছেনা। ৪ জনের টিম নিয়ে সেই কাজেই বেরিয়েছিল পরশু দুপুরে। খবর ছিল বাজারের পিছনের নতুন গজিয়ে ওঠা ফ্লাটটায় আছে একটা মেয়েছেলে নিয়ে।একদম অভ্যেস মতোই দরজা ভেঙে ঢুকে পড়েছিল। পরপর দুটো দানা দিলীপ এর জোড়া ভুরুর মাঝে । সেই সময় মেয়েছেলটা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো। পরনের কাপড় নেই সেটা তখন খেয়াল নেই। সামনে দিলীপের বডি। মেয়েছেলটা ঝাঁপিয়ে পড়লো।নগ্নতা দিয়ে মৃত্যুর গন্ধটা ঢেকে দিতে। তার মেঠো গন্ধটা তো বহুদিন আগেই দীনেশের বুকে হারিয়ে গ্যাছে।


বট

বয়সের কোনো গাছ পাথর নেই। বা উল্টোটা, গাছের কোনো বয়স পাথর নেই! ৭০-৭২ কিংবা তারও আগে থেকে সে আছে। যখন লাইনের এপার ছিলনা, শুধু ওপার। বোসেদের জ্ঞাতি গুষ্টি। আর সুভাষ বোসের পৈতৃক ভিটেটা। এপারে তো তখন ধান আর ধান। সে নিজে দেখেছে কুমীর আসতে।শিয়াল তো কদিন আগে অব্দি ছিল। মানুয়া দের তিনতলাটা তখন কোথায়। একটু ঘাড় উচালেই ওপারের সরস্বতীর মাঠ, আর এপারে তো সেই বাঁকাতলা অব্দি দেখতো।

আদতে সে বেওয়ারিশ।পিতৃ পরিচয়হীন। কে যে কবে চারা ফেলে দিয়ে গেছিলো, নাকি নিজেই ভুঁইফোড় হয়ে নির্লজ্জের মত জায়গা দখল করেছিল মনে পরেনা।

আসলে বয়সের তো কোনো গাছ পাথর নেই। সে নকশাল দেখেছে, ৭০-৭৭ দেখেছে, বাম দেখেছে, অতিবাম ডান সবই গিলেছে।
সেই যেবার অক্ষয় বোসের ছোট ছেলেটাকে কংগ্রেসিরা বস্তা করে নিয়ে এসে ক্ষেতের মাঝে পুঁতে দিল, খানিক ভয় করেছিল বটে। প্রথমে তো ছেলে গুলো ঠিক করেছিল ওর গোড়াটা খুঁড়ে সেখানেই...নাহ জায়গাটায় কোনো শহীদ বেদী নেই, ওটা তো বাম আমলে তৈরি হওয়া মার্কেট। সবই জাতির উন্নতির জন্য। প্রথম প্ৰথম ভয় করলেও পরে এরম আরো ঋজু বোস ওর অভিজ্ঞতাটা পুষ্ট করেছিল।

৭৮-৮০ অব্দি মনে প্রানে ঘোর বামপন্থীই ছিল।কিন্ত বাধ সাধল কমরেড এক্স সরকার(যেহেতু জীবিত লোকেদের নামে বলতে নেই)। কংগ্রেসের আ্যকশন স্কোয়াডের বাপি ঘোষ অনেকদিনের টার্গেট ওর। যবে থেকে দেখেছিল দিদির সরস্বতী পুজোর লাল শাড়িটা কালচে রক্তে শুকিয়ে ফাঁসুড়ের গামছার মতো দেখাচ্ছে।যাতে যৌবন সাজাপ্রাপ্ত। দ্রুত বদলে যাওয়া আর্থ সামাজিক যোগসাজসে বাপিও বদলাতে চেয়েছিল। কিন্তু  গণতন্ত্রের নিয়মানুযায়ী যা হয়ে আসছে, উঁচু তলার 'বদলা নয় বদল চাই' আপ্তবাক্যের সাথে সাথে বাপিকেও মরতে হলো।দিদি কে বিয়ে করে ঘর করার কাকুতি মিনতিতেও কমরেড সরকার ভেঙে পড়েনি। শ্রেণী শত্রু মুক্ত সমাজ গড়ার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েই নিজে হাতে ছুরিটা চালিয়েছিল। উন্মাদনায় মৃত যোনি কি তবে কাটা নলির ফিনকি ওঠা রক্তে প্রাণ ফিরে পাবে? ভেবেই শিউরে উঠেছিল ও। সেই তো সবে শুরু।

বয়স তো কম না। কত কান্ডই তো দেখল।সেই যখন রেল স্টেশন টা পাকা হলো, সে এক হুলুস্থুল কান্ড।মুটে মজুর মিস্ত্রি গুলো তো ওর চারপাশেই তাঁবু গেড়েছিল।কত রকম মাপ ঝোঁক শিখল।শিখল সরকারি মাল ঝেঁপে দিয়ে নিজের উঠোন বাঁধানোর কায়দা।ইট বালি পাথর ধুলোয় কদিনেই হাঁপিয়ে উঠেছিল। আসলে সেটা ছিল গ্রামীণ অর্থনীতিতে শহুরে পোঁচ লাগার উপসর্গ মাত্র।

তবে ওর কদরও বাড়ল।লোকে স্টেশন ধারের জায়গাটাকে ওর নামেই নাম দিয়ে দিল।হয়ত বয়সের সম্মানের কথা ভেবেই। বা সহজ করে ডাকার সুবিধার জন্যে।

ওর আশপাশটা দ্রুত পাল্টাচ্ছিল। যুক্তফ্রন্ট আমলে যে জায়গা ধানি জমি ছিল, সেখানেই দোকানে বসে সব ছোট মেজ বড় কমরেডরা বাবরি ভাঙার খবর শুনলো।রেল লাইন উন্নত হবার সাথে সাথে কাটা পড়াটাও সমানুপাতিক ছিল, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত।অগত্যা হিসাব ব্যস্তানুপাতিক করার জন্যে গজিয়ে উঠল মন্দির। ওর গা ঘেষেই। ও ভক্তি করতে শিখল।

চিত্রনাট্য দ্রুত বদলাচ্ছিল। জন্মদিনের সানাই থেকে শুরু করে শ্রাদ্ধের মন্ত্র অব্দি রপ্ত হয়ে গেছিল। ডান থেকে বাম , বাম থেকে ডান দেখলো। মনে আছে সোভিয়েত রাশিয়া পতনের পরের সকালটা। সেই প্ৰথম ওর মাইক বেঁধে সভা দেখা।তার পরে তো পেট্রোল,ডিজেল,অনাহার,অবিচার, মূল্যবৃদ্ধি এবং ইত্যাদি ছিলই অথবা আছে। ক্রমে দুর্গা,কালি হালে গনেশ সবাই যোগ দিল।লাশ গেলো মার্কেট এলো, প্যাডেল গেলো মোটর এলো, ভিটে গেল মাটি এল(যেহেতু রামকৃষ্ণ দেব বলেছেন টাকা মাটি, মাটি টাকা)।

অতএব বয়স তো কম না।কোনো গাছ পাথর নেই, বা উল্টোটা।





সায়া


আজ সকাল থেকেই কপাল ফাটছে। চড়চড় করে। ফার্স্ট ডায়মন্ড হারবার লোকাল আজ মিস হল একটুর জন্যে।হাটে আসতে পুরো এক ঘণ্টারও বেশি দেরি হলো।
সপ্তাহে একদিনই কাঁটাতলার এই হাটে আসে গোপাল। সংগ্রামপুর থেকে ভোর বেলা  ফার্স্ট ডায়মন্ড হারবার লোকাল ধরে সোনারপুর। সেখান থেকে ম্যাজিক ভ্যানে করে বামনঘাটা বাজার। সেখান থেকে আবার ভ্যানে করে কাঁটাতলা।
এক বৃহস্পতিবার করেই হাট বসে। বেচা কেনা মন্দ হয়না। আশপাশের গ্রামের লোক হাটের ভরসাতেই থাকে।
গোপাল যখন বছর চারেক আগে এই হাটে আসা শুরু করে তখন কিন্তু এতো রমরমা ছিল না। হালে লোকগুলোর হাতে কাঁচা পয়সা হয়েছে। কাছেই ওই ডালমিয়ার লেদার কমপ্লেক্স হওয়ার পরে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চালচিত্রটা অবশ্যই কিছুটা হলেও পাল্টেছে। পাল্লা দিয়ে গোপালদের মত হকার দের সংসারে লক্ষ্মীও সচলা থেকে অচলা হবার চেষ্টা করেছে।
 আজ তো শালা লক্ষ্মীবার সকালটা শুরুই হলো অলক্ষ্মীর মুখ ঝামটা দিয়ে।তখনই বুঝেছিল আজ পুরো দিনটা মাগীর মুখ ঝামটাতেই পুড়ে গেলো।
কোনো ইচ্ছেই ছিলনা গোপালের বিয়েটা করার। বিয়ের আগে থেকেই চিনত জ্যোতিকে। আর জানত ওর নামের মতই জ্বলজ্বলে মুচমুচে চালু কিসসা কাহিনী গুলো।
কিন্তু বিদ্যাসাগর মশাই যে লিখে গেছেন 'গোপাল বড় সুবোধ বালক'। তাই বাবার চানাচুর এর ব্যাবসার মতই ডুবন্ত সংসারটার সেই তখন মসীহা।জ্যোতির বাপ ব্যাবসাটা সামলানোর জন্যে জামাই খুঁজছিল!!কিন্তু মুচমুচে গল্প বলিয়ে ছেলেরা কেউই গল্পের চরিত্র হতে রাজি হয়না।অগত্যা কন্যার 'দায়গ্রস্ত' বাপকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে ততোধিক 'দায়'গ্রস্ত গোপাল।
রাজকন্যা না হলেও রাজত্ব তো ছিলই। ভবতারণ সায়া হাউস। ডায়মন্ড হারবার, বাসন্তী, নামখানা, চাম্পাহাটি এসব জায়গায় ভালই দোকান ধরা ছিল। আর ছিল হাট বার।
সম্মিলনী কলেজের প্ৰথম বর্ষের ছাত্রী জবার প্রেমিক কবি গোপাল খুব দ্রুত কবিতার খাতা গুলো সাপ্তাহিক হিসেবে নিকেশে ভরিয়ে ফেলল।
তবে বাকি সব কিছু বাপের চানাচুর এর মত নেতানোই রয়ে গেল।
জ্যোতির কাছে গোপাল একটা পরজীবী। ওর বাপ ছিল বলে বেঁচে গেছে। আজ অব্দি লোকটা জানেনা ওর গায়ের ঘামের গন্ধটা কিরকম। আর ওর বুকের মাঝের তিলটা, যেটা পলাশ বন্য জন্তুর জল খাওয়ার মত করে চাটতো। রাত হলেই হিসাবের খাতা আর সায়ার বান্ডিল। এক এক সময় মনে হয়েছে, সায়া দিয়ে কি ফাঁস বাঁধা যায়!!
মাঝে মাঝে ভাবে লোকটা কি আদেও ব্যাটাছেলে!!ওকে দেখলে পাড়ার ছোকরা গুলো অব্দি দাঁড়িয়ে চুলে টেরি কাটে!!
পাড়ার ছেলেদের সাথে জ্যোতির ব্যাপারটা গোপাল জানে। সে বালক সুবোধ, অবোধ নয়। আজও হাট থেকে বাড়ি ফেরার সময় দেখলো বিল্টু, বাচ্চুরা ওর বাড়ির পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারছে। চকচকে চোখ গুলো নতুন মুচমুচে গল্পের খোঁজে জ্যোতির আশপাশেই ঘুরছে। মাগীটা নীচু হয়ে উঠোন ঝাঁট দিচ্ছে দেখতে পেলো।কি এমন আছে ওর?? একটা পাতলা নেতিয়ে যাওয়া হলদে শাড়ি পরে। নীচে একটা লালচে সায়া। সায়ার পিছনটা সেলাই খুলে ফেটে গেছে। গোপালের কপালের মতোই। ফাটা সায়ায় কি ফাঁস বাঁধা যায়!!!

Tuesday, March 7, 2017

২৬ শে

                             এক
ময়নার আজ একদম দম ফেলার সময় নেই।মাঝে আর দুটো দিন।এবারে অনেকগুলো অর্ডার পেয়েছে।পাড়ার ক্লাব, নতুন পার্টি অফিস, লস্কর পাড়ার ছোটনদের ক্লাব, সব থেকে বড় অর্ডার তো দিলো মাস্টার এসে। হাই স্কুলের পুরো অর্ডারটা। আর এমনি ওদের দোকানের খুচরো বিক্রি তো আছেই।
বরটা কদিন ধরেই পেটের ব্যামো তে ভুগছে। সাথে বেওয়ারিশ মাছির মত জ্বরটাও ঘোরা ফেরা করছে। হরেন ডাক্তার তো বলছে সবই বাংলার দয়ায়। রোজ সন্ধ্যে হতেই তো আদা, লঙ্কা, তাস আর বাংলা। তিনদিন বিছানায় সোহাগ করে, আজ তাকেও কাজে লাগতে হয়েছে। এতো গুলো অর্ডার।
তবে উৎসাহ বেশি খোকনের। স্কুলের তো বালাই নেই দুদিন। সকাল সকাল সাদা, সবুজ, গেরুয়া কাগজ নিয়ে বসে পড়েছে পতাকা বানাতে।
"খোকন আর কটা বাকি রে তোর?"
"এই তো মা আর বেশি নেই। এই ২৫ কি ৩০ টা। মা আমি একটু খেলে আসবো। এসে আবার করে দিচ্ছি বাকি গুলো।"
"ওরে আমার মারাদোনা। আর না মাড়িয়ে সব শেষ করে আমার থেকে কিছু নে। শালা লাট সাহেবের বাচ্চা হয়েছে। বাপ এই শরীল লিয়ে খাটছে উনি যাবেন খেলতে।"  ময়না কিছু বলার আগেই তারক খেচিয়ে উঠলো।
ওর বয়সী যখন ছিল ময়না, তখন স্কুলে খেলা ধুলায় বেশ নাম ডাক ছিল ওর। প্রতি বছর প্রাইজ বাঁধা।
স্পোর্টসের বর্ণালীদি বলত,"তুই একদিন স্টেট খেলবিরে ময়না। তোর হবে।'
পড়াশুনাতেও খারাপ ছিলনা।বাপটা সামন্তর ইঁট ভাটায় কাজ করত। কিন্তু মেয়ের হাত পোড়াতে চায়নি। পি.টি.ঊষার নাম পেপারে দেখেছিল বাপে। মেয়ে ডিস্ট্রিক্ট এ দৌড়ে ফার্স্ট হলেও বাপটা পারলনা। টি.বি ফার্স্ট বাপ লাস্ট।মা গেল সামন্তর হাতে, আর ও সামন্তর ডান হাত তারক এর সাথে ডিস্ট্রিক্ট ছাড়িয়ে সোজা স্টেটে, কলকাতা।
                             দুই
পিউলির আজ সকাল থেকে নাভিশ্বাস উঠছে। কাজের মেয়েটা দুদিন ধরে আসছেনা।
সকালে উঠে পাপাই কে স্কুলের জন্য রেডি করা, শোভনের অফিসের টিফিন করা, তার পরে,রান্না চাপাও। মাঝে শাশুড়ীর চানের জল, তুলসী পাতা দিয়ে, গঙ্গাজল দিয়ে শুদ্ধ করে। সেসব করে বাকি সবার জন্যে টিফিন। তাও কাজের মেয়েটা থাকলে সবজি কাটা, বাটনা বাটা, কাচা কুচি, বাসন মাজা এগুলো কমে।

আসলে এরম তো ছিলনা। বাগবাজারে বনেদি বাড়ির মেয়ে সে। একান্নবর্তী পরিবারে বেড়ে ওঠা। যদিও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিয়মে তাদের বনেদিয়ানাও স্বাধীনতার বয়সের সাথে সাথে বাস্তানুপাতিক নিয়ম বজায় রেখেছে। তবুও পড়াশুনায় খামতি হয়নি। রবি ঠাকুর, শরৎ চাটুজ্জে, বিভূতিভূষণে ভর করে মেয়ে সাহিত্য নিয়েই পড়ছিল রবীন্দ্রভারতী তে। ইচ্ছে তখন লেখিকা হবার। তাসলিমা অনুপ্রেরণা।
আচমকাই একদিন আলাপ শোভন এর সাথে। কফিহাউসে। রাজাবাজার সায়েন্সের শোভন তখন কলমে চে গ্যুভেরা, মননে ঋত্বিক। জুটিতে ময়দান, ভিক্টরিয়া আর নন্দন দখল করতে বেশি সময় লাগেনি।
বাধ সাধল একদিন বড় জেঠু দেখে ফেলায়। তখন শোভন সবে ব্যাঙ্ক এর চাকরি পেয়েছে। দুই বাড়িতে কথা বলে বিয়ে পাকা।
বিয়ের দেড় বছরেই পাপাই। অঞ্জন দত্ত শুধু ল্যাপটপ এই চলে, শোভনের গলায় না। স্বাধীন লেখিকা হবার স্বপ্ন বিয়ের তিনদিনের মাথাতেই গতিপ্রাপ্ত হয় যখন পিউলি বোঝে তার শাশুড়ী আদতে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অতন্দ্র প্রহরী।
আদতে সে সামাজিক স্বীকৃতি প্রাপ্ত একজন পরজীবী জীবে পরিনত হয়েছে।
                               তিন
দুদিন ধরে কাজে যায়নি ময়না। বৌদিদি ভালো লোক। নয়তো এতদিন এ কাজ থেকে তাড়িয়েই দিতো। আসলে এতো গুলো পতাকার অর্ডার ছিল এবারে। এই টাকা গুলো পেলে খোকন কে একটা নতুন স্কুল এর জামা কিনে দিতে হবে। বরটার পেটের ব্যামোটার ও কিছু টেষ্ট বলেছে ডাক্তার।কালই তো ২৬শে জানুয়ারী। সময় তো হয়েই এলো। সব আসবে এবার মাল নিতে।

"পাপাই পড়তে বসে যা। বাপি এসে কিন্তু পড়া ধরবে। না পারলে কাল চিড়িয়াখানা ক্যান্সেল।" ছেলেটা আসলে শোভন এর মতোই হয়েছে। দামাল, ভয়ডরহীন। যে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে স্লোগান দিতো, গণতন্ত্রের ভাষা বলতো।
ময়নাকে পিউলি ইচ্ছে করেই ছুটি দিয়েছে।বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে। বারবার বলছিলো ওর বরের শরীর খারাপ। অনেক গুলো অর্ডার । না দিতে পারলে অনেক লস।
"পাপাই জোরে পড়। শুনতে পাচ্ছিনা।"
"২৬শে জানুয়ারি ১৯৫০ ভারতের সংবিধান আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ পায়। ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হয়।"


পরমাণু গল্প



  #১
বাসি থালাটার কানায় শুধু শুকনো ঝোল লেগে ছিল। চৌকির তলা থেকে আরশোলা দুটো মারামারি করে খেতে এল।
ওরাও অনেকদিন অভুক্ত।
#২
দুটো শালিখ কবাডি খেলছিল উঠোনে  , থুরি ফ্লাটের নিচে গ্যারেজটায় !!

#৩
কিছুতেই ঘুম আসছেনা  অম্লানের। কুহেলির ঘুম পাড়ানি নাক ডাকার তালটা নেই। চিতা হয়ে গেছে।

#৪
বাজারের সবাই দেখছে সন্ধে থেকে কুকুর দুটো জোড় লেগে আছে। ওদের এটাই স্বাভাবিক। মানুষ গুলো ইতু পাগলির সাথে বিল্লু আর ওর ছেলেদের দেখতে পায়নি।

#৫

বিকেলের রোদ্দুরটা অলসভাবে শুয়ে পড়েছে।।বিপুল দাস আর জোৎস্না সরকার হয়ে। ৭৭ এর মাঘ মাসের সেই নজরদারি তো এই বৃদ্ধাবাসে নেই।

#৬
তিনটে আরশোলা। চিৎ কেলিয়ে পাশাপাশি পরে আছে। ওদের থেকে ঠিক হাত খানেক দূরেই খালি শিশিটা দাঁত কেলিয়ে হাসছে।আরো তিনটে শিকারের মস্তিতে। প্রথম শিকারটা একটু আগেই মুচমুচে গল্প হয়ে গেল। ছেঁড়া যোনি নিয়েই।

#৭
 ট্যাক্সিতে উঠেই শুনল ড্রাইভারটা গুনগুন করে গান গাইছে। "বড় একা লাগে এই আঁধারে..."।সাত বছর আগে শেষ শুনেছিল, ল্যান্ড লাইনের ওপারে। আবীরকে আর ফোন করা হলোনা নূপুরের।

#৮
এত মিষ্টি ধূপের গন্ধটাও অসহ্য লাগছে জয়িতার। পোড়া চামড়ার গন্ধটা কিছুতেই সুযোগ দিচ্ছে না ওকে। সাথে ওই বদরাগী ঘাম টা।

#৯
আপাদমস্তক চাদরে ঢেকে ঘুমাচ্ছে জয়। এই দগদগে গরমেও। কাল ঠিক যেমন করে কুহেলি শুয়ে ছিল হাসপাতালের বেডে।

#১০
অমাবস্যা গলির অন্ধকারটাকে দুরন্ত স্কিলে টালমাটাল ডজ করতে করতে এগিয়ের যাচ্ছে শোভন। ৪১/বি শ্যামাচারণ মিত্তির লেনের বাড়িটার দিকে। হুইস্কির আমেজটা ঠান্ডা পানের সাথে বেশ আরামে মিশে যাচ্ছে।হুট করে একটা মেয়েলি হাত শোভনের কাঁধটা সামলে ধরল।
-"এই কমলী ছোড় দে আজ মুঝে। পকেটে একটা পয়সা নেই মাইরি। একটা বেলফুলের মালাও...."
-"বাবু আমি তোর মা!!"

#১১
ভীষণ লজ্জা লাগছে শর্মিলার। ওর ভরা বসন্তের উদোম শরীরটাকে লোকগুলো হাঁ করে মন দিয়ে গ্রাস করছে। ওর চোখ, মুখ, স্তন, নাভি, যোনি সব কিছু দুর্ভিক্ষের নেশায় গিলে খাচ্ছে ওরা। ওর কিচ্ছুটি বলার নেই স্টেথো গলার পুরুষ গুলোকে। আ্যনাটমি ক্লাসে যেরম হয় আর কি!!

#১২
৮.২৫ এর বারুইপুর লোকালটাও বেরিয়ে গেল। দু ঘন্টা ধরে স্টেশনে বসে সব সব্জিওয়ালাদের ডাকাডাকি, দরাদরি পুরো দাড়ি কমা সমেত মুখস্থ হয়ে গেছে পরিমল সরকারের। দীর্ঘদিন যাবৎ আর্মিতে চাকরি করার সুবাদে চেহারার পাশাপাশি ধৈর্যটাও বেশ ভালো,এই বয়সেও। ছোট ছেলে ব্রতীন ডিউটি থেকে ফেরার সময় মোটামুটি এই সময়েই ফেরে। ৮.২৫ এর বারুইপুর লোকাল। আজ এই ট্রেনে তো এলোনা। বয়স্ক মানুষটি জানেন এবার কোনো কারণে দেরী হচ্ছে। ওনার এখনো বীরগতিচক্রর মেডেলটা মিথ্যেই লাগে।

#১৩
নধর কচি মুরগী দুটো দিব্বি এক্কা দোক্কা খেলছে উঠোনে ।ঠিক যেমন করে একটু পরে খেলবে জুঁই আর শিউলি। এক্কা দোক্কা ...উবু দশ, কুড়ি, ত্রিশ...একদম কচি বাবু...জবাই হবার আগে।

#১৪
আকাশ কালো করে বৃষ্টি এসে কাগজের হেডলাইনটা ঢেকে দিল ঝুপ করে। অগত্যা সাতের পাতায় আড়াই ইঞ্চি। অহংকারী নম্বর প্লেটের সাথে পিষে যাওয়া ফুটপাথের আর জাতে ওঠা হল না!!



ঘুগনি

দুদিন হলো তাস খেলাটা বন্ধ।সেদিন সুকুমার এর সাথে ঝামেলার পর থেকে।

১১.০৫ এর শেষ ট্রেনটা এরা সবাই ধরে। লেদার কমপ্লেক্স এর ১ নম্বর গেট থেকে বাসে পার্কসার্কাস স্টেশন আসে মনিরুল। বালিগঞ্জ থেকে ওঠে নিতাই। বালিগঞ্জ স্টেশনের কাছেই ঘুগনি বিক্রি করে। মথুরাপুর নামে।হাঁড়িতে চারজনের মতন করে ঘুগনি নিয়েই ওঠে। সুকুমার আর শ্যামল শিয়ালদা থেকেই জায়গা রেখে আসে।

দুদিন ধরে সুকুমার নেই। সোমবার রাতে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছিল। তাস খেলায় অতন্ত্য আপাত সাধারণ একটা ব্যাপার।

"সুকুটা বড্ড বেশি গায়ে মাখেরে শ্যামল। তা বাপু তাস খেলতে এয়েছিস, এট্টু তো ইদিক ওদিক হবোই।"

"আসলে লোকডা বড় সৎ মানুষ গো নিতাই দা। সেই হরেকেষ্ট কোঙার যখন আসত হাই ইস্কুলের মাঠে , সেই থেকে লাল পার্টি করে ও দাদা। ঘর ভর্তি কেতাব।"
মনিরুল বলল।

"তোকে এত খবর কে দ্যায় রে ?"শ্যামল জানতে চায়।

"আরে আমার চাচা আর সুকুদা হকার ইউনিয়ন করে গো একসাথে বড়বাজারে।"

"নে ঘুগনিটা শেষ করে বাপধন তোরা।"

"কাকা একটু ঘুগনি পাওয়া যাবে?" ছেলেটা গতকাল থেকে এই কামরায় যাচ্ছে। শিয়ালদা থেকেই ওঠে। বাচ্ছা ছেলে। এখনো সরু গোঁফের রেখায় ব্লেড পড়েনি একবারও। গতকাল ওদের পাশে বসেই ফিরল।

"বাপি ঘুগনি খেতে খুব পছন্দ করে।এক বাটি একটু হবে কাকা? এই টিফিন বক্স করে বাড়ি নিয়ে গে দিতুম।"

"আমাদের ঘুগনিখেকো লোকডা দুদিন ধরে আসতিছে না। তা বেশিই আছে। নে যা তুই।"নিতাই আপত্তি করেনা।

"এই ছাওয়াল তোর বাপ এখন এই অবস্থায় ঘুগনি খাবে?" ছেলেটা তেউনি পরে। মনিরুলের কথায় ব্যাপারটা বাকিদের খেয়াল হল।

"চাচা বাপি সোমবার এই ট্রেনে তোমাদের সাথে তাস খেলে আর বাড়ি ফেরেনি গো। পথেই ব্রেন ইসট্রোক। ভোরবেলা তেই সব শেষ।"

ছেলেটা ঘুগনির গন্ধটা শুকতে লাগলো।