Tuesday, March 7, 2017

২৬ শে

                             এক
ময়নার আজ একদম দম ফেলার সময় নেই।মাঝে আর দুটো দিন।এবারে অনেকগুলো অর্ডার পেয়েছে।পাড়ার ক্লাব, নতুন পার্টি অফিস, লস্কর পাড়ার ছোটনদের ক্লাব, সব থেকে বড় অর্ডার তো দিলো মাস্টার এসে। হাই স্কুলের পুরো অর্ডারটা। আর এমনি ওদের দোকানের খুচরো বিক্রি তো আছেই।
বরটা কদিন ধরেই পেটের ব্যামো তে ভুগছে। সাথে বেওয়ারিশ মাছির মত জ্বরটাও ঘোরা ফেরা করছে। হরেন ডাক্তার তো বলছে সবই বাংলার দয়ায়। রোজ সন্ধ্যে হতেই তো আদা, লঙ্কা, তাস আর বাংলা। তিনদিন বিছানায় সোহাগ করে, আজ তাকেও কাজে লাগতে হয়েছে। এতো গুলো অর্ডার।
তবে উৎসাহ বেশি খোকনের। স্কুলের তো বালাই নেই দুদিন। সকাল সকাল সাদা, সবুজ, গেরুয়া কাগজ নিয়ে বসে পড়েছে পতাকা বানাতে।
"খোকন আর কটা বাকি রে তোর?"
"এই তো মা আর বেশি নেই। এই ২৫ কি ৩০ টা। মা আমি একটু খেলে আসবো। এসে আবার করে দিচ্ছি বাকি গুলো।"
"ওরে আমার মারাদোনা। আর না মাড়িয়ে সব শেষ করে আমার থেকে কিছু নে। শালা লাট সাহেবের বাচ্চা হয়েছে। বাপ এই শরীল লিয়ে খাটছে উনি যাবেন খেলতে।"  ময়না কিছু বলার আগেই তারক খেচিয়ে উঠলো।
ওর বয়সী যখন ছিল ময়না, তখন স্কুলে খেলা ধুলায় বেশ নাম ডাক ছিল ওর। প্রতি বছর প্রাইজ বাঁধা।
স্পোর্টসের বর্ণালীদি বলত,"তুই একদিন স্টেট খেলবিরে ময়না। তোর হবে।'
পড়াশুনাতেও খারাপ ছিলনা।বাপটা সামন্তর ইঁট ভাটায় কাজ করত। কিন্তু মেয়ের হাত পোড়াতে চায়নি। পি.টি.ঊষার নাম পেপারে দেখেছিল বাপে। মেয়ে ডিস্ট্রিক্ট এ দৌড়ে ফার্স্ট হলেও বাপটা পারলনা। টি.বি ফার্স্ট বাপ লাস্ট।মা গেল সামন্তর হাতে, আর ও সামন্তর ডান হাত তারক এর সাথে ডিস্ট্রিক্ট ছাড়িয়ে সোজা স্টেটে, কলকাতা।
                             দুই
পিউলির আজ সকাল থেকে নাভিশ্বাস উঠছে। কাজের মেয়েটা দুদিন ধরে আসছেনা।
সকালে উঠে পাপাই কে স্কুলের জন্য রেডি করা, শোভনের অফিসের টিফিন করা, তার পরে,রান্না চাপাও। মাঝে শাশুড়ীর চানের জল, তুলসী পাতা দিয়ে, গঙ্গাজল দিয়ে শুদ্ধ করে। সেসব করে বাকি সবার জন্যে টিফিন। তাও কাজের মেয়েটা থাকলে সবজি কাটা, বাটনা বাটা, কাচা কুচি, বাসন মাজা এগুলো কমে।

আসলে এরম তো ছিলনা। বাগবাজারে বনেদি বাড়ির মেয়ে সে। একান্নবর্তী পরিবারে বেড়ে ওঠা। যদিও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিয়মে তাদের বনেদিয়ানাও স্বাধীনতার বয়সের সাথে সাথে বাস্তানুপাতিক নিয়ম বজায় রেখেছে। তবুও পড়াশুনায় খামতি হয়নি। রবি ঠাকুর, শরৎ চাটুজ্জে, বিভূতিভূষণে ভর করে মেয়ে সাহিত্য নিয়েই পড়ছিল রবীন্দ্রভারতী তে। ইচ্ছে তখন লেখিকা হবার। তাসলিমা অনুপ্রেরণা।
আচমকাই একদিন আলাপ শোভন এর সাথে। কফিহাউসে। রাজাবাজার সায়েন্সের শোভন তখন কলমে চে গ্যুভেরা, মননে ঋত্বিক। জুটিতে ময়দান, ভিক্টরিয়া আর নন্দন দখল করতে বেশি সময় লাগেনি।
বাধ সাধল একদিন বড় জেঠু দেখে ফেলায়। তখন শোভন সবে ব্যাঙ্ক এর চাকরি পেয়েছে। দুই বাড়িতে কথা বলে বিয়ে পাকা।
বিয়ের দেড় বছরেই পাপাই। অঞ্জন দত্ত শুধু ল্যাপটপ এই চলে, শোভনের গলায় না। স্বাধীন লেখিকা হবার স্বপ্ন বিয়ের তিনদিনের মাথাতেই গতিপ্রাপ্ত হয় যখন পিউলি বোঝে তার শাশুড়ী আদতে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অতন্দ্র প্রহরী।
আদতে সে সামাজিক স্বীকৃতি প্রাপ্ত একজন পরজীবী জীবে পরিনত হয়েছে।
                               তিন
দুদিন ধরে কাজে যায়নি ময়না। বৌদিদি ভালো লোক। নয়তো এতদিন এ কাজ থেকে তাড়িয়েই দিতো। আসলে এতো গুলো পতাকার অর্ডার ছিল এবারে। এই টাকা গুলো পেলে খোকন কে একটা নতুন স্কুল এর জামা কিনে দিতে হবে। বরটার পেটের ব্যামোটার ও কিছু টেষ্ট বলেছে ডাক্তার।কালই তো ২৬শে জানুয়ারী। সময় তো হয়েই এলো। সব আসবে এবার মাল নিতে।

"পাপাই পড়তে বসে যা। বাপি এসে কিন্তু পড়া ধরবে। না পারলে কাল চিড়িয়াখানা ক্যান্সেল।" ছেলেটা আসলে শোভন এর মতোই হয়েছে। দামাল, ভয়ডরহীন। যে ছাত্র ইউনিয়নের মিছিলে স্লোগান দিতো, গণতন্ত্রের ভাষা বলতো।
ময়নাকে পিউলি ইচ্ছে করেই ছুটি দিয়েছে।বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে। বারবার বলছিলো ওর বরের শরীর খারাপ। অনেক গুলো অর্ডার । না দিতে পারলে অনেক লস।
"পাপাই জোরে পড়। শুনতে পাচ্ছিনা।"
"২৬শে জানুয়ারি ১৯৫০ ভারতের সংবিধান আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ পায়। ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হয়।"


No comments:

Post a Comment